চেঙ্গিস খান

বিশ্ববিজেতা চেঙ্গিস খান সম্পর্কে অজানা তথ্য

ইতিহাস সম্পর্কে যার সামান্যতম ধারণা আছেন তিনি অবশ্যই মঙ্গোল সাম্রাজ্যের মহান শাসক চেঙ্গিস খানের নাম শুনেই থাকবে। পৃথিবী বিখ্যাত যোদ্ধা হিসেবে তিনি ব্যাপক পরিচিত। ধ্বংস, হত্যা, ক্ষমতা, লিপ্সা এবং রণকুশলতার এক অভূতপূর্ব মিশেলে গড়া চেঙ্গিস খানের জীবন কাহিনী যেন জীবন্ত সিনেমার মত। আজকের আর্টিকেল পড়লে চেঙ্গিস খানের জীবনের অজানা তথ্য সম্পর্কে জানতে পারবেন। চলেন তাহলে শুরু যাক।

জন্ম ও জন্মস্থান

মঙ্গোলিয়ার স্তেপ বা তৃণ চারণভূমিতে জন্ম হয়েছিল ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই বিজেতার। ধারণা করা হয় যে, চেঙ্গিস খানের জন্মস্থান ছিল উত্তর মঙ্গোলিয়ার খেনতি পর্বতমালার অন্তর্ভুক্ত বুরখান খালদুন পর্বতের খুব কাছে দেলুন বলদাখ নামের এক জায়গায়। সম্ভবত তার জন্ম হয় ১১৬২ সালে। বলা হয়ে থাকে, ওনন নদীর পাড়ে তৃণচারণ ভূমিতেই তার বেড়ে ওঠা।

আসলেই চেঙ্গিস কি তার প্রকৃত নামঃ

সারা পৃথিবীর কাছে তিনি পরিচিত চেঙ্গিস খান নামে, তবে এই বিশ্ব বিজেতার আসল নাম কিন্তু চেঙ্গিস নয়। “চেঙ্গিস খান” তার উপাধি। “তেমুজিন” তার প্রকৃত নাম। অনেক যুদ্ধ এবং রক্তপাতের পর ১২০৬ সালে তেমুজিন যখন সমগ্র মঙ্গোলিয়ান স্তেপের একক অধিপতি হিসাবে আবির্ভূত হন তখন তাকে “চেঙ্গিস খান” উপাধি দেওয়া হয়। যার বাংলা অর্থ “সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি”। একারণেই তার পিতৃদত্ত নাম তেমুজিন কালের অতলে হারিয়ে গেছে চেঙ্গিস নামের গৌরব ও পরাক্রমের কাছে।

চেঙ্গিস খানের যৌবন ও উত্থানকালঃ

মাত্র ১৭ বছর বয়সে তেমুজিন ঘরে তুলে আনলেন তার বাল্যবধূ বোর্তেকে।চেঙ্গিসের জীবনে হাজার হাজার নারীর সঙ্গ আসলেও বোর্তে ছিল তার প্রথম ও শেষ ভালবাসা। অসংখ্য সন্তানের পিতা হওয়া সত্ত্বেও শুধু বোর্তের গর্ভে জন্ম নেওয়া চার ছেলেকেই উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত করেছিলেন তিনি। বোর্তে আর তেমুজিনের এই ভালবাসা ইতিহাসে বেঁচে আছে অনন্য হয়ে। বেঁচে আছে বোর্তের গর্ভে জন্ম নেওয়া চেঙ্গিসের চার ছেলের নাম জোচি, তুলুই, ওদেগিই, চুঘতাই খানের মাধ্যমে। 

চেঙ্গিস খান মঙ্গোলদের একত্রিত করে মঙ্গোল রীতির বিরুদ্ধে গিয়ে বিভিন্ন মঙ্গোল গোষ্ঠীর সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন। শত্রু জাতির প্রধানদের হত্যা করে, জীবিত সদস্যদের নিজের গোষ্ঠীর সাথে একীভূত করেন। সমস্ত অঞ্চলগুলো জয়ের আগ পর্যন্ত তিনি লুটপাটের অর্থ সংরক্ষিত রাখেন। তিনি তার যোদ্ধা দলকে মোট ১০টি ইউনিটে ভাগ করেন। সকল প্রতিদ্বন্দ্বীের হটিয়ে ১২০৫ সালরে দিকে সমগ্র মঙ্গোলিয়ার অধিপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। 

চেঙ্গিস খানের ধর্মঃ

চেঙ্গিস খান ছিলেন একজন টেংগ্রিস্ট, তবে তিনি অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিলেন। অন্যান্য ধর্মের দর্শন ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। তিনি একই সাথে বৌদ্ধ ভিক্ষু, মুসলমান, এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন। তবে চেঙ্গিস খান এবং তার পরবর্তী  সম্রাটগণ কুরবানির মত ইসলামিক প্রথার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

কারণ কুরবানি ছিল মঙ্গোল প্রথার বিরুদ্ধাচরণ। যার ফলে চেঙ্গিস খানের সময় মুসলমানেরা লুকিয়ে পশু কুরবানি দিত।চেঙ্গিস খানের কাছে মুসলমান এবং ইহুদিরা ছিল ‘দাসের’ মত। তাদের খাদ্যাভ্যাসে মঙ্গোল নীতি পদ্ধতি অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‘সুন্নৎ’ করার উপরে তিনি নিষেধাজ্ঞা  জারি করেন। তাছাড়া তিনি ‘কোশের’ খাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয় যার ফলে ইহুদিদের মধ্যে  বিরূপ প্রভাব দেখা দেয়।

চেঙ্গিস খানের আইনঃ

চেঙ্গিস খান প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষের শাসক ছিলেন। তার জনগণের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সদস্যরা ছিল। অতীতে যুদ্ধের কারণগুলো দমন করার জন্য তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া উপাধির চল দমন নীতি গ্রহণ করেন। একই সাথে তিনি নারীদের অপহরন এবং বিক্রয় প্রথা বন্ধ করেন। মঙ্গোলদের মধ্যে দাসপ্রথা বন্ধ করেন। গৃহপালিত প্রাণী চুরি করার অপরাধে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আইনও জারি করেন। তাছাড়া চেঙ্গিস খান একটি লিখিত ব্যবস্থা গ্রহনের আদেশ দেন। নিয়মিত আদমশুমারি করার পদ্ধতি চালু করেন। তাছাড়া তিনি বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের কূটনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করেন।

চেঙ্গিস খানের মৃত্যুঃ

১২২৫ সালে জাপান সাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারি তিনি ছিলেন। এরপর তিনি মঙ্গোলিয়ায় ফেরত আসেন। ১২২৭ সালে ঘোড়া থেকে পরে গিয়ে আহত হন চেঙ্গিস খান, যার ফলে দেহের অভ্যন্তরে গুরুতর ভাবে আঘাত পান তিনি। শি শিয়া রাজ্য দখলে তিনি অংশ নেন  কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ রূপে সুস্থতা লাভ করতে পারে নিই । শি শিয়া রাজ্য পতনের ঠিক আগেই ১২২৭ সালের ১৮ই আগস্টে চেঙ্গিস খান পরলোকগমন করেন।

ইতিহাসের যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় চেঙ্গিস খান দ্বিগুণ পরিমাণে রাজ্য জয় করেছিলেন। তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম সভ্যতাকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার পরবর্তী বংশধরেরাও সফল শাসক হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অবশেষে ১৯২০ সালে চেঙ্গিস খানের শেষ বংশধর মৃত্যুবরণ করে এবং চেঙ্গিস খানের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটে ।

চেঙ্গিস খানের উক্তিঃ

চেঙ্গিস খানের কিছু উক্তি বেশ বিখ্যাত। তার কয়েকটি নিচে দেয়া হল-

  • যদি আমার দেহ মারা যায় তবে আমার দেহটি মরুক, তবে আমার দেশকে মরতে দেবেন না। – চেঙ্গিস খান
  • দেয়ালগুলির শক্তি নির্ভর করে যারা তাদের রক্ষা করেন তাদের সাহসের উপর। – চেঙ্গিস খান
  • যারা পারদর্শী এবং সাহসী সহযোগী ছিল আমি তাদের সামরিক কমান্ডার করেছি। যাঁরা তাড়াতাড়ি এবং নিম্ম ছিল তাদের আমি ঘোড়ার পালকে পরিণত করেছি। যারা পারদর্শী ছিল না তাদের আমি একটি ছোট চাবুক দিয়েছি এবং রাখাল হওয়ার জন্য পাঠিয়েছি – চেঙ্গিস খান
  • ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ নতুন শহর ঘুরে নতুন লোকের সাথে দেখা করা। – চেঙ্গিস খান
  • আমার জীবনটি পুরো বিশ্বের বিজয় অর্জনের জন্য খুব ছোট ছিল। – চেঙ্গিস খান
  • ঘোড়ার পেছন থেকে বিশ্বকে জয় করা সহজ। – চেঙ্গিস খান
  • যদি আপনি ভয় পান – এটি করবেন না – আপনি যদি এটি করেন তবে ভয় করবেন না! – চেঙ্গিস খান
  • মনে রাখবেন, আপনার ছায়া ছাড়া আপনার কোনও সাহাবী নেই – চেঙ্গিস খান
  • একজন নেতা তার মানুষ সুখী না হওয়া পর্যন্ত কখনই খুশি হতে পারে না। – চেঙ্গিস খান

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.