জামের উপকারিতা

জামের বিশেষ ৯টি স্বাস্থ্য উপকারিতা

এশিয়ার পরিচিত একটি মৌসুমি ফল হল জাম। জাম গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও জুন, জুলাই বা আগস্ট মাসেও পাওয়া যায়। জামে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থসহ এবং অনেক ঔষধি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর অনন্য রঙ (বেগুনি কালো) এবং স্বাদ বেশিরভাগ মিষ্টি ও সামান্য টক। অন্যান্য ফলগুলোর তুলনায়, জাম স্বাস্থ্যকর এবং এতে আছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি। জামের বিচি, পাতা এবং ছালের ঔষধি মূল্য রয়েছে এবং এটি বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাগুলোতে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এর  চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকের প্রবন্ধে,  জামের বিশেষ ৯টি স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বলবো। আশা করি আপনারা মনোযোগ দিয়ে পড়বেন।

  1. ডায়াবেটিস নিরাময়ে সাহায্য করে: জাম ভীষণ উপকারী ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬.৫ শতাংশ মানুষের ডায়াবেটিক কমে গেছে যারা নিয়মিত জাম খায়। রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে জাম সাহায্য করে। জাম ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখতে জাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জামের বীচির গুঁড়া এক চা চামচ প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
  2. ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ দূর করে: প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি জামে পাওয়া যায়। এই ফল ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ করে। তাছাড়া মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাঢ়ি শক্ত এবং মাঢ়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই। জামে পানি, লবণ ও পটাসিয়ামের মতো বিদ্যামান উপাদান রয়েছে। যা গরমে শরীর ঠাণ্ডা এবং শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও জামে প্রচুর পরিমাণ আয়রন রয়েছে, যা রক্তস্বল্পতা দূর করে।
  3. হার্ট ভালো রাখে: রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃৎপিণ্ড ভাল রাখতে জাম বেশ উপকারী। এছাড়া শরীরের দূষিত মাত্রা কমিয়ে তাছাড়া দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় এবং সেই সাথে শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্র কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে জাম বেশ উপকারী।
  4. ওজন নিয়ন্ত্রণ করে: জাম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কারণ জামে অল্প পরিমাণে ক্যালোরি থাকে, যা ক্ষতিকর তো নয়। তাই যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। তারা খাদ্য তালিকায় অবশ্যই জাম রাখতে পারেন।
  5. ক্যান্সার প্রতিরোধে উপকারী: জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যান্সারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষা করে। সেই সাথে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে জাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজারে অনেক রকমের রঙিন ফল পাওয়া এসব ফলে অনেক যৌগিক উপাদান থাকে। কিন্তু  এর মধ্যে জামে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে। তাছাড়া জরায়ু, ডিম্বাশয় ও মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জাম লড়াই করে দেহকে সুরক্ষা করে।
  6. সাদা বা রক্ত আমাশয়: জামের কচি পাতার রস ২-৩ চা-চামচ একটু গরম করে ছেঁকে নিয়ে খেলে ২-৩ দিনের মধ্যে সেরে যায় সাদা বা রক্ত আমাশয়।
  7. অরুচি ও বমিভাব: পাকা জামে  লবণ মাখিয়ে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা রেখে দিন। এরপর সেটা চটকে পুঁটলি বেঁধে টানিয়ে রাখলে যে রস ঝরে পড়বে, সেটা ২০-২৫ ফোঁটা বা এক চা চামচ পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে দিলে অরুচি ও বমিভাব কমে যাবে।
  8. শয্যামূত্র: শয্যামূত্র রোগে শিশু থেকে বৃদ্ধ অনেকেই অসুবিধায় পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানের জন্য মায়েদেরও ভুগতে হয়। এক্ষেত্রে ২-৩ চা চামচ জাম পাতার রস ২-৩ চা চামচ (বয়স অনুপাতে মাত্রা) এবং গাওয়া ঘি ১/২ চা চামচ মিশিয়ে প্রতিদিন একবার করে খাওয়ালে এক সপ্তাহের মধ্যে উপকার পাবেন।
  9. রক্তবন্ধে: জাম ছালের রস ১-২ চা চামচ ছাগলের দুধের সাথে মিশিয়ে ১-২ চা চামচ খেলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।
  10. দাঁতের মাড়ির ক্ষতে: যাদের মাড়ি আলগা হয়ে গিয়েছে, অল্পতে রক্ত পড়ে, তারা জাম ছালের গুঁড়া দিয়ে দাঁত মাজলে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যে উপকার পাবেন।

এছাড়া জামে রয়েছে ফাইটো কেমিক্যালস এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি দেয়। ইনফেকশনের মতো সমস্যাও প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

জামের বিচির উপকারিতাঃ

আমরা সাধারনত জাম খেয়ে আমরা সাধারণত জামের বিচি ফেলে দেই, কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা, জামের বিচির গুনাগুন সম্পর্কে। আয়ুর্বেদী চিকিৎসায় এর গুনাগুন অপরিসীম। আগে জানতে হবে, জামের বিচি কিভাবে খাওয়ার উপযোগী হিসেবে তৈরী করতে হয়।

প্রথমে জামের বিচি গুলো থেকে উপরে কালো যে জামের শ্বাস(উপরের অংশ) রয়েছে তা ছাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর জামের বিচির উপরে একটা আবরন থাকে সেটিও ছাড়িয়ে নিতে হবে। এরপর এটি ভালমতো ধুয়ে নিয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে । ভালমতো শুকানো হলে গেলে গুড়ো করতে হবে।  গুঁড়ো করার পর চালুনিতে চেলে নিতে হবে। তারপর জামের বিচির গুঁড়ো একটি বায়ু-নিরোধক শিশিতে রেখে দিন এবং প্রয়োজন মতো ব্যবহার করুন। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক গ্লাস জলে এক চা-চামচ জামের বিচির গুঁড়ো মিশিয়ে  পান করুন। এবার চলেন জেনে নেওয়া যাক বিচির উপকারিকা সম্পর্কে।

জামের বিচির উপকারিতাঃ

  1. প্রাথমিক পর্যায়ে যাদের ডায়বেটিস আছে, তাদের কোন ধরনের ঔষধ খাওয়ার দরকার নেই। বরং তাঁরা যদি নিয়মিত জামের বিচি খায় তাহলে ডায়বেটিস কমে যাবে। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে বিশেষজ্ঞরা, জামের বিচি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। জামের ফল ও বিচিতে জাম্বোলাইন ও জাম্বোসাইন নামক পদার্থ রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জামের বীজও রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেও জামের বিচি বেশ উপকারী।
  2. এছাড়া ক্যান্সার প্রতিরোধক উপাদন জামের বিচিতে রয়েছে।
  3. যাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অনেক কম তাঁরা নিয়মিত জামের বিচি খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিন মাত্রা বজায় থাকবে।
  4. ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ,ফসফরাসের মতো খনিজ উপাদান জামের বিচিতে রয়েছে। যা হাড়কে শক্ত সুস্থ্য ও স্বাভাবিক রাখে।

জামের পাতার উপকারিতাঃ

জাম গাছের পাতার অনেক ওষধিগুণ রয়েছে। যে কেউ চাইলে খুব সহজে সারা বছর জুড়েই জাম পাতা পেতে পারেন। চিকিৎসার ভাষায় গাছটির নাম সিজিজিয়াম কিউমিনি। 

  • জামের পাতায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি অ্যান্টি-ভাইরাস ও প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও এই পাতার রস রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং অ্যালার্জি দূর করতে জাম পাতার রস বেশ কার্যকারী।
  • জাম পাতার রস কমাতে ওজন  বেশ উপকারী। গরম পানিতে জাম পাতা গরম পানিতে ১০ মিনিট ধরে ফুটাতে হবে যতক্ষণ পানির রং সবুজ না হয়। এরপর নামিয়ে ফেলে, প্রতিদিন সকালে পান করতে পারেন।
  • একইভাবে নিম পাতার সঙ্গে ফুটিয়ে পান করলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
  • অনেকের খুব বেশি চুল পড়ে, তখন কারিপাতার সঙ্গে জাম পাতা পানিতে ফুটিয়ে পান করুন। মুখের ক্ষত সারাতেও এই মিশ্রণটি কার্যকর।
  • বর্তমান সময়ের সব থেকে মারাত্নক সমস্যা হল ১)অতিরিক্ত ওজন ২) ডায়াবেটিস। সমাধান পেতে চাইলে জাম পাতা রোদে শুকিয়ে গুড়ো করে নিন। সজনে পাতার গুড়োর সঙ্গে জাম পাতার গুড়ো মিশিয়ে পান করুন। এটি একইসাথে ওজন কমাতে সাহায্য করবে, আবার রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতেও সহায়তা করবে।

গর্ভাবস্থায় কেন কালো জাম খাবেনঃ

গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি কালো জাম খাওয়া বেশ উপকারী। কারণ এটি গর্ভবতীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে। নিম্নে গর্ভাবস্থায় কালো জামের উপকারিতা গুলো দেওয়া হলো—

হার্টের সুরক্ষায়ঃ

কালো জামে  ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যানথোসায়ানিনস থাকে যা হার্টের সুরক্ষায় সাহায্য করে। হার্টের ব্লকের ঝুঁকি কমাতে এর ফাইবার ও ম্যাগনেসিয়াম সাহায্যে করে। সেই সাথে রক্ত সঞ্চালনও স্বাভাবিক রাখে।

ক্যান্সার প্রতিরোধেঃ

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে রক্ষা কবজ হিসেবে কালো জাম কাজ করে। এটি ম্যালিগন্যান্ট কোষ বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে।

হাড় শক্ত করেঃ

কালো জামের মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে। যা হাড় ও দাঁত মজবুত করে। ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম হাড় শক্ত করা নিশ্চিত করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ

এর মধ্যে থাকা ফাইবার হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দূর করে। তাছাড়া এটি অন্ত্রে প্রয়োজনীয় পানি শোষণ করে।

ত্রুটিপূর্ণ জন্ম প্রতিরোধ করেঃ

কালো জামে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড রয়েছে। যা শিশুর ত্রুটিপূর্ণ জন্ম প্রতিরোধ করে। তাছাড়া কার্ডিওভাসকুলার হৃদরোগ এবং গর্ভে থাকা শিশুর বিভিন্ন ত্রুটি প্রতিরোধ করে।

পরিশেষে, জামের এত উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ফল জাম। তাই পতিত জায়গাগুলোতে জামের চারা রোপণ করতে হবে। যার ফলে  একদিকে যেমন আমাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *